Pandharpurer Sree Vitthelji Darshane

পান্ধারপুরের শ্রীভিঠঠলজী দর্শনে

আথেনা মজুমদার

সপ্তমীর দুপুরে যখন পুনে পৌছালাম, তার কিছু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে, টারমাকের জল শুকিয়ে যায়নি তখনো। পান্ধারপুরের সবচেয়ে কাছের এয়ারপোর্ট পুনে, তাই কলকাতা থেকে পুনেতে এলাম, যাবো পান্ধারপুর, কানড়া রাজা পান্ধরিচা (পান্ধারপুরের কালো/অজ্ঞেয় রাজা) শ্রীভিঠঠল দর্শনে। পুনে এয়ারপোর্ট বাগডোগরার মতো এয়ারফোর্সের এয়ারপোর্ট, কয়েকটি কমার্শিয়াল ফ্লাইট ওঠানামা করে, যদিও আয়তনে বাগডোগরা এয়ারপোর্টের থেকে অনেকটাই বড়। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে আসতে আসতে দেখলাম, রাস্তায় এদিক ওদিক জল জমে আছে আর ঠান্ডাও লাগছে (পুনে সমুদ্র থেকে ৫৬০ মিটার উচ্চতায় পশ্চিমঘাট পর্বতমালার ছায়াচ্ছন্ন পাশে অবস্থিত)। পুনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, শিবাজি মহারাজের নাম। দুইদিন শিবাজিরস্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলো দর্শন করে পান্ধারপুরের যাব।

মুলা ও মুথা এই দুটি নদীর সঙ্গম স্থলে গড়ে উঠেছে পুনে, আয়তনের দিক থেকে মহারাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। পুনে ভারতের বৃহত্তম আইটি হাবগুলির মধ্যে একটি। অটোমোবাইল উৎপাদনের জন্য পুনে বিখ্যাত। এখানে অনেক কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি রয়েছে, রয়েছে এঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানেজমেন্ট, মেডিক্যাল কলেজ, রির্সাচ ইনস্টিটিউট। সেই কারণে একে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়। আবার পুনেকে মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক রাজধানীও বলা হয়। মহারাষ্ট্র কালচারাল সেন্টার, রাহ লিটারেসি এন্ড কালচারাল সেন্টার, পুনে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার এখানে অবস্থিত। প্রতি বছর ‘সওয়াই গন্ধর্ব, ভীমসেন মহোৎসব’ এর আয়োজন হয় এখানে। থিয়েটার, এবং নানা লিটেরারি মিটেরও আয়োজন হয়ে থাকে।

পরদিন সকালে স্থানীয় এক এজেন্সি থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে বেরিয়ে প্রথমে গেলাম শনিওয়াড়ওয়াদা। ১৭৩২ সালে প্রথম পেশোয়া বাজিরাও এর নির্মাণ করেন। শনিবার এই গৃহ নির্মানের কাজ শুরু হয়েছিল তাই নাম শনিওয়াড়, ওয়াদা অর্থবাসস্থান। সাততলা এই ভবনটির ছয়টি তলাই ১৮২৮ সালের এক বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে যায়, বর্তমানে পাঁচটি দরজা বিশিষ্ট পাথরের তৈরি নিচের তলাটি অবশিষ্ট আছে। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। পেশোয়াদের ফ্যামিলি ট্রি এবং সংক্ষিপ্ত আকারে এই ভবনের ইতিহাস লেখা আছে সেখানে।

লাল মহল, পুনে শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত, কথিত আছে, শিবাজির শৈশব কেটেছে এখানে। কিন্তু পুরানো কিছু নেই, বর্তমানে এটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ, শিবাজির জীবনের নানা কাহিনি এখানে তেল রঙে আঁকা রয়েছে। জিজাবাই-এর স্ট্যাচু, রায়গড় ফোর্টের মডেল দিয়ে সাজানো লালমহল। রায়গড় ফোর্ট পুনে থেকে প্রায় ১৪৩ কিলোমিটার, এ যাত্রায় যাওয়া হবে না, তাই ‘দুধের সাধ’ ইত্যাদি আর কী!

সিংহগড় ফোর্ট পুনে শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে সহ্যাদি পর্বতে অবস্থিত, পাহাড়ি রাস্তা পৌঁছাতে প্রায় এক ঘন্টা লাগল। গাড়ি পাহাড়ের পাদদেশে রেখে এবার হাঁটার পালা। এই সেই সিংহগড় ফোর্ট, যাকে উদ্ধার করতে ১৬৭০ সালে তানাজী জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। শিবাজি বলেছিলেন, ‘গড় আলা পন সিংহ গেল’ (গড় পেলাম, কিন্তু সিংহ রইল না।)। এমন কোন বাঙ্গালি আছে, যে ছোটোবেলায় অন্তত একবার আবৃত্তি করেনি, ‘জীজাবায়ে শুধু কহিলা শিবাজী/সিংহগড়ের সিংহ গিয়াছে, পড়ে আছে শুধু গড়,/তাই লও মাতা হারায়ে পুত্র তানাজী মালেশ্বর!’

হাঁটতে আরম্ভ করলাম, খানিকটা পথ মাত্র উঠেছি, ঝিরঝিরে বৃষ্টিপড়তে আরম্ভ করল, রাস্তার পাশে এক দম্পতি চা এবং সঙ্গে রেইন কোর্ট বিক্রি করছে। চা খেয়ে রেইন কোট কিনে ওপরে রওনা হলাম। এবার ঘন কুয়াশা নেমে আসতে থাকল। কুয়াশা ঢেকে দিচ্ছিল চারিধার, ক্যামেরা আর বের করা সম্ভব হল না, হল না ছবি তোলা। শুধু স্পর্শ করলাম সেই মাটি যেখানে শিবাজী এবং তানাজীর মতো বীরের পদধূলি পড়েছে। দুর্গে রয়েছে, তানাজী, রাজারামের সমাধি, রয়েছে কয়েকটি ঘর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত এই দুর্গ, কিন্তু ওই যে বলে বিধি বাম, আমার তাই হল, বৃষ্টি আর কুয়াশায় কী আর দেখব! ট্রেকিং-এর জন্যও বিখ্যাত এই দুর্গটি, দেখলাম কয়েকজন ট্রেকার বৃষ্টি কুয়াশা উপেক্ষা করেই চলছেন পাহাড়ি পথে।

পুনে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত দাগদুশেঠহালওয়াই গণপতি মন্দির। এই মন্দিরটি ২০২৪ সালে ১৩২ বছরের গণেশ উৎসব পালন করেছে। মূল গণেশ বিগ্রহটির এক কোটি টাকার বীমা করা আছে। জুতো-মোবাইল জমা রেখেলাইনে দাঁড়ালাম, নবরাত্রি উপলক্ষ্যে সব মন্দিরেই ভক্তগণ সমাগত হয়েছে, দীর্ঘ লাইন। প্রায় এক ঘন্টা লাগল দর্শন করতে। লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক পুনে থেকেই প্রথম সর্বজনীন গণেশ উৎসবের সূচনা করেন। এরপরে গেলাম শ্রীসিদ্ধিবিনায়ক গণেশ মন্দির, পুণ্যার্থীদের ভিড় সেখানেও।

পরদিন রৌদ্রস্নাত সকালে প্রথমে গেলাম কেসরী ওয়াদা, লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক কর্তৃক ১৮৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত কেসরী সংবাদপত্রের অফিসে। এখনো সেখান থেকে দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। যে প্রিন্টিং প্রেস থেকে প্রথম সংবাদপত্র ছাপা হয়েছিল, সেই প্রিন্টিং প্রেস এখনো আছে। সংলগ্ন একটি গৃহে তিলকের ব্যক্তিগত বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিস, স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন ফটোগ্রাফ, মন্দালয় জেলের (যেখানে ১৯০৮ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত তিলককে বন্দী করে রাখা হয়েছিল) রেপ্লিকা নিয়ে ১৯৯৯ সালে গড়ে উঠেছে এই মিউজিয়াম। তিলকের পরিবার ও কেসরী মারাঠা ট্রাস্ট এর দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে।

পুনে থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার একটি জনপ্রিয় ও মনোরমহিল স্টেশন লোনাভালার পথে যখন রওনা দিলাম তখন আকাশে মেঘ জমেছে আবার। প্রশস্ত রাজপথ ধরে গাড়ি চলতে থাকলে আশপাশের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি দেখতে থাকলাম। প্রথমে গেলাম ইন্দেয়ানি নদীর ধারে, এই নদীর উপর ১৮৬০ সালে মূলত রেল যাতায়াতের জন্য তৈরি হয়েছিল ভুষি বাঁধ। প্রচুর মানুষ প্রতিদিন এই জায়গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসে। টুরিস্টরা কেউ কেউ বাঁধের সোপানে বসে ছবি তুলছে, গান করছে। কার্লা গুহার কাছে যখন পৌছালাম তখন চরাচর ঘন কুয়াশায় ঢাকা, ছবি তোলার উপায় নেই। কুনে জলপ্রপাত দেখে খান্ডালা ঘুরে পুনের পথ ধরলাম যখন তখন আবার বৃষ্টি নেমেছে। লোনাভালায় গেলে এখানকার প্রসিদ্ধ মিষ্টি চিক্কি না খেয়ে ফেরা যায় না।

ফেরার পথে গেলাম পুনের শিবাজি নগরের জংলী মহারাজ রোডে অবস্থিত অষ্টম শতাব্দীতে, রাষ্ট্রকূটদের সময়ে তৈরি পাতালেশ্বর শিব মন্দির। ইলোরা গুহা মন্দিরের মতো একটি মাত্র পাথর কেটে এই মন্দিরটি তৈরি হয়েছে, কিন্তু মন্দিরটির গঠন অসম্পূর্ণ। অনেকের মতে শিলাখন্ডটি অত্যন্ত শক্ত হওয়ায় মন্দিরটি সম্পূর্ণ করা যায়নি। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসকালে এক রাতের মধ্যে মন্দিরটি সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করেছিলেন। একটি বৃত্তাকার নন্দী মণ্ডপ, এবং গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গ রয়েছে। শিব ছাড়া গণেশ দুর্গারও পুজো হয়। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে।

পরদিন সকালে রওনা হলাম, এনএইচ ৯৬৫ ধরে পান্ধারপুরের পথে, পুনে থেকে দূরত্ব প্রায় ২০৪ কিলোমিটার। ড্রাইভার জানাল প্রায় চার ঘন্টা লেগে যাবে পৌঁছাতে। সমুদ্র থেকে ৪৫৮ মিটার উচ্চতায়সোলাপুর জেলার অন্তর্গত পান্ধারপুর অবস্থিত ভীমা নদীরপাশে। নদীটি অর্ধচন্দ্রাকারে পান্ধারপুরকে বেষ্টন করে থাকায় একে চন্দ্রভাগা নদীও বলা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, পান্ধারপুর ভূ-বৈকুন্ঠ। শ্রীকৃষ্ণ এখানে ভিঠঠল রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। অনেকে আবার বিশ্বাস করেন, শ্রীভিঠঠলের মূর্তি বর্তমান কর্নাটকের হাম্পি থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়। দ্বিতীয় কৃষ্ণদেবরায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, বিধর্মীদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হাম্পিতে এখনও বিজয় ভিঠঠল মন্দির রয়েছে, যদিও সেখানে শ্রীভিঠঠলের মূর্তি নেই। কিন্তু এই বিশ্বাসের পাথুরে প্রমাণ নেই। প্রাপ্ত শিলালিপি অনুযায়ী বর্তমান মন্দির, হৈসালা সাম্রাজ্যের বিষ্ণুবর্ধন ১১০৮-১১৫২ সালের মধ্যে তৈরি করেন। যদিও ভিঠঠল এখানে পূজিত হন তার অনেক শতাব্দী আগে থেকেই। অনেকবার আধুনিকীকরণ হয়েছে এই মন্দিরের। আষাঢ় মাসে(জুন-জুলাই) পান্ধারপুরে সবচেয়ে বড় উৎসব হয়, আনুমানিক এক লক্ষ ভক্ত সমাগম হয় তখন। গত ৭০০ বছর ধরে, ভক্তরা যারা ‘ওয়ারকারি’ (যিনি বা যারাওয়ারী বা তীর্থযাত্রা সম্পন্ন করেন) ২১ দিনধরে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ হেঁটে ভিঠঠল মন্দিরে পৌঁছান। অনেকে জুতো পরেন না পর্যন্ত, খালি পায়ে, ‘আভংগ’(কীর্তন) গাইতে গাইতে পথ চলতে থাকেন, এমনকি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেও। এই ধর্মীয় যাত্রায়, নানা বর্ণের, নানা পেশার মানুষ, ধনী, নির্ধন, নারী পুরুষ একসাথে চলতে থাকেন। অনেকে তুলসী গাছ মাথায় নিয়ে হাঁটতে থাকেন। এই মন্দির ছাড়াও ইসাবিতে আরেকটি ছোট ভিঠঠল মন্দির রয়েছে, সেটাও মূল মন্দিরের মত পুরানো। সন্ত তুকারাম, নামদেব, একনাথ এঁরা সবাই ভিঠঠলের উপাসনা করেছেন এখানে। এক মতে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুও এখানে অন্তত সাতদিন অতিবাহিত করেন।

চন্দ্রভাগা নদীর ধারে পুন্ডলিক মন্দির। পুণ্যার্থীরা চন্দ্রভাগা নদীতে স্নান করে, পুন্ডলিককে প্রণাম করে শ্রীভিঠঠল দর্শনে যান। একটি কালো তরুণ কোমরে হাত রেখে একটা ইটের উপর দাঁড়িয়ে আছেন মন্দিরে, তাঁর কানে মাছ আকৃতির কুন্ডল, এই মূর্তিতে পূজিত হন শ্রীভিঠঠল। ভিঠঠলের সঙ্গে রুক্মিণীও পূজিত হন। পুন্ডলিক ছিলেন ভিঠঠলের প্রধান ভক্ত। পুন্ডলিকের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভিঠঠল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর গৃহে যান, পুন্ডলিক তখন তার বাবা-মায়ের সেবা করছিলেন। তিনি ভিঠঠলকে একটি ইট দিয়ে বলেন তার উপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে, (‘ভিট’ ইটের মারাঠি শব্দ), তিনি বাবা-মায়ের সেবা করে তারপর শ্রীকৃষ্ণের সামনে আসবেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পুন্ডলিকের তার বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধ দেখে অত্যন্ত খুশি হয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। বাবা-মায়ের সেবা শেষ করে পুন্ডলিক শ্রীকৃষ্ণের কাছে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তো পুন্ডলিকের উপর রাগ করেননি, তিনি পুন্ডলিককে বর দিতে চাইলে, পুন্ডলিক তাঁকে অনুরোধ করেন, তিনি পুন্ডলিককে যে রূপে দেখা দিয়েছেন, সেই রূপেই যেন সব ভক্তকে দেখা দেন। তাই এখানে শ্রীকৃষ্ণ ভিঠঠল, অর্থাৎ যিনি ইটের উপর দাঁড়িয়ে আছেন।

আরেকটি কাহিনি এই রকম, এক দুস্থ ধীবর একবার তার ধরা মাছ নিয়ে এসে ভিঠঠলকে নিবেদন করতে চাইল, মন্দিরের পূজারী মাছ নিয়ে মন্দিরে ঢুকতে দেননি তাকে। সে দুঃখে বিলাপ করতে থাকে মাছ ছাড়া তার তো আর কিছু নেই, যা সে ভিঠঠলকে নিবেদন করতে পারে, সে ভক্তিভরে মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে সেই মাছ দুটি ভিঠঠলকে নিবেদন করলে, ভিঠঠল তার উপহার গ্রহণ করেন, এবং সেই মাছ দুটিকে তাঁর দুই কর্ণে ধারণ করেন। এইরকম নানা কাহিনি জড়িয়ে আছে এই মন্দির ঘিরে। মহারাষ্ট্র ছাড়াও কর্নাটকের মানুষরাও ভিঠঠলকে দর্শন করতে সারা বছর আসে এখানে।

ভিঠঠল মন্দিরে দুরকম দর্শনের ব্যবস্থা আছে। দূর থেকে প্রণাম করা যায়, আর এক রকম পদ-স্পর্শ দর্শন, মন্দিরের ভিতরে ঢুকে ভিঠঠল-রুক্মিণীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা যায়। মোবাইল,ব্যাগ জমা রেখে, জুতো খুলে প্রথমে দূর থেকে দর্শন করে, পদস্পর্শ দর্শনের লাইনে দাঁড়াব ঠিক করেছিলাম। দশমী সেদিন, এমন ভিড় যে সেই দূরের দর্শনের সুযোগ পেতেও অনেক সময় লাগল। পদস্পর্শ দর্শনের লাইন তখন একেবেঁকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। পদস্পর্শ দর্শন সেদিন ভাগ্যে ছিল না। চন্দ্রভাগা নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকলাম, সেখানে রয়েছে পুন্ডলিকের মন্দির। সেখান থেকে গেলাম মাতা পদ্মাবতী মন্দির।

বিকেলে গেলাম, তুলসী বৃন্দাবন পার্কে, পদ্মাবতী লেকের পাশে অবস্থিত পার্কটি। প্রবেশদ্বারের সামনে রয়েছে ২৫ ফুটের ভিঠঠলের মূর্তি। সারা পার্কের দেয়াল জুড়ে ম্যুরাল, বিভিন্ন সন্তদের জীবনালেখ্য ছবির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে। বিভিন্ন ছবির পাশে কিউ আর কোড রয়েছে, তা স্ক্যান করলে সেই ছবির বিষয়ে, তার সঙ্গে জড়িত গল্প জানা যায়। সন্তদের মার্বল স্ট্যাচু, নানা ধরনের ফুলের গাছদিয়ে সাজানো সে পার্ক। প্রায় ১৮ ধরনের তুলসী গাছ আছে, আছে নানা ভেষজ গাছও। ভিঠঠল কীর্তন শুনতে শুনতে, পদ্মাবতী লেকের জল লাল করে সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখলাম।

একাদশীর সকাল সেদিন, পুজো শেষ তাই মন্দিরে হয়তো কম ভিড় থাকবে, ভেবে সকাল সকাল মন্দিরের পথে রওনা দিলাম, পদস্পর্শ দর্শন করতে। মনে মনে বলছিলাম, ‘উথা পান্ডুরঙ্গা প্রভাত সময়ো পাতলা, আতা দর্শন দেয়া সকলা’ (হে পান্ডুরঙ্গা, ভিঠঠল, প্রভাত হয়েছে, এখন ঘুম থেকে ওঠ, সবাইকে দর্শন দাও।) কিন্তু পৌঁছে দেখলাম সেদিন ভোর থেকেই বিশাল লাইন, স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী একাদশীর দিন প্রত্যেক পরিবারের অন্তত একজনকে শ্রীভিঠঠল-রুক্মিনীর পদস্পর্শ দর্শন করতে হবে, তাতে যতই সময় লাগুক। দূর থেকে দর্শন সেরে ইসাবির শ্রী ভিঠঠল মন্দিরে গেলাম, সেখানে শেষ পর্যন্ত পদস্পর্শ করে ভিঠঠলকে প্রণাম করতে পারলাম। মন্দির চত্বরে বসে আছে অনেক মানুষ, কেউ কেউ বা খঞ্জনি বাজিয়ে কীর্তন করছে, বহু পথ হেঁটে যারা মন্দিরে পৌছাতে পেরেছে, তাঁর দর্শন পেয়েছে, তারা ভিঠঠলের গুণগান করছে। অনেক মানুষ হাতে গেরুয়া পতাকা নিয়েই পথ চলছে। আলাপ হল, এক দম্পতির সঙ্গে, তাঁরা আগে কোনো বাঙালিকে শ্রীভিঠঠলজী দর্শন করতে দেখেননি, জিজ্ঞাসা করছিলেন, আপনি ভিঠঠলের কথা জানলেন কী করে? শুধু ওরা নয়,স্থানীয় হোটেলের ম্যানেজার, গাড়ির চালক, সবার একই প্রশ্ন।

এবার ফেরার পালা, পুনে হয়ে কলকাতায় ফিরলাম দ্বাদশীর বিকেলে। পুনে-কলকাতার মধ্যে অনেকগুলি ট্রেন রয়েছে, যেমন পুনে দুরন্ত এক্সপ্রেস, আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেস, পুনে হামসফর এক্সপ্রেস। পান্ধারপুরের সবচেয়ে কাছের এয়ারপোর্ট পুনে, পুনে এবং সোলাপুর থেকে ট্রেনে শ্রীভিঠঠল মন্দিরের থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বের পান্ধারপুর স্টেশনে পৌঁছান যায়। পুনে থেকে সারাদিন ৪৩টি বাস যাতায়াত করে পান্ধারপুরে। থাকার জন্য এখানে ধর্মশালা, হোটেল আছে। পুনেতে এবং পান্ধারপুরে অনেক ট্র্যাভেল এজেন্সি আছে, গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়, বেড়ানোর জন্য।

সাম্প্রতিক সংযোজিত প্রতিবেদন

দ্রষ্টব্যঃ এই ওয়েব ম্যাগাজিনে কিছু ছবি ইন্টারনেট থেকে ব্যবহৃত হতে পারে। তাদের দিকে আমাদের আত্মিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই ম্যাগাজিনে তথ্য এবং মন্তব্যসমূহ লেখক/লেখিকাদের দ্বারা প্রদান করা হয়েছে, প্রকাশক/সম্পাদক কোনো বার্তা, মন্তব্য, ভুল অথবা বিষয় অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে কোনও দায়বদ্ধতা গ্রহণ করেন না।
কপিরাইট © ২০২৬.
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত: রংরুট.অনলাইন
ডিজাইন ও ডেভেলপ করেছে: উইকিইন্ড
রক্ষণাবেক্ষণ: টিম রংরুট