পরিকল্পনা শুরু করেছিলাম প্রায় এক বছর আগে। নানা ট্রাভেল ম্যাগাজিন ও গুগল বাবার থেকে তথ্য নিয়ে কোথায় কোথায় থাকব, কী কী দেখব, কোন কোন স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেব ইত্যাদি। একটু আগে থেকে বুক করায় ফ্লাইটের টিকিট পেলাম সাধ্যের মধ্যে। অবশেষে আমরা তিনজনে (স্ত্রী-কন্যা-আমি) কলকাতা থেকে দুপুর ২:৪৫-এর বিমানে চেপে বসলাম। পীরপঞ্জাল পর্বতমালা অতিক্রম করে শ্রীনগর ছুঁয়ে সন্ধ্যা ৭:১৫ মিনিটে নামলাম জম্মুতে। আমরা চেয়েছিলাম দেবদর্শন দিয়ে শুরু হোক আমাদের সফর। জম্মু বিমানবন্দরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ট্যুরের গাইড কাম সারথী তাহির ভাই। তাঁর সুইফট ডিজায়ারে চেপে আমরা কাটরায় জম্মু কাশ্মীর পর্যটন নিগমের সরস্বতী হোটেলে পৌঁছলাম রাত প্রায় ১০টা নাগাদ। অর্থাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাতের আস্তানায় পৌঁছতে বারো ঘন্টা লেগে গেল। যতই আকাশ পথে আরামদায়ক হোক না কেন, যাত্রার একটা ধকল থাকেই। তার উপর পরদিন খুব ভোরে শুরু আমাদের সফর। অতএব চটপট বিছানায়। ঘুমের অতলে ডুবে যাওয়ার আগে মনে হচ্ছিল, জীবনের একটা বড় সাধ তাহলে পূর্ণ হতে চলেছে এবার।
‘কাশ্মীর’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ “কাশ্যপমর” থেকে। এখানে ‘কাশ্যপ’ হলেন প্রাচীন ঋষি কাশ্যপ এবং ‘মীর’ বা ‘মর’ শব্দের অর্থ হল জলাশয় বা হ্রদ। অর্থাৎ কাশ্মীর মানে ‘কাশ্যপের জলাশয়’। এই নামের পেছনে একটি পৌরাণিক কাহিনি আছে— কাশ্মীর এক সময় একটা বিশাল হ্রদ ছিল, যার নাম ছিল ‘সতীসর’। ঋষি কাশ্যপ ওই হ্রদের জল নিষ্কাশন করে অঞ্চলটিকে বসবাসের উপযোগী করে তোলেন। তারপর থেকেই জায়গাটি কাশ্মীর নামে পরিচিতি লাভ করে। কাশ্মীরের নাম প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য রাজতরঙ্গণীতে উল্লেখ আছে। তাতে কাশ্মীরকে পবিত্র ও সমৃদ্ধ ভূমি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পরদিন ভোর পাঁচটার আগেই স্নানটান সেরে হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা অটো করে প্রথমে পরচি কাউন্টার থেকে পরচি সংগ্রহ করে ‘ভবন’-এর উদ্দেশে রওনা হলাম। প্রবেশ দ্বারে পরচি দেখিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। প্রায় আড়াই কিমি হাঁটার পর অনুভব করলাম পুরোটা হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। দরদাম করে ঘোড়ায় চড়ে বসলাম। ঘোড়ার পিঠে চেপে আমরা অর্ধ্বকুয়ারী পর্যন্ত গেলাম। সেখান থেকে ব্যাটারি গাড়িতে চেপে যেতে হয় বাকি পথ। কিন্তু আমাদের জানা ছিল না অনলাইনে বুকিং হয় এই ব্যাটারিচালিত কারের সিট। অগত্যা এগারো নাম্বার অর্থাৎ পদব্রজে ছাড়া উপায় নেই। সাত কিমি পথ হেঁটে আমরা ‘ভবন’-এ পৌঁছলাম প্রায় ১১টা নাগাদ। সেখানে কাউন্টারে ব্যাগ-জুতো-ফোন জমা করে তারপর মাতাজী দর্শনের জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে লাইন গুহামুখে এগোতে থাকে এবং একসময় সুষ্ঠুভাবে দর্শন সম্পন্ন হলো। নির্ধারিত কাউন্টার থেকে প্রসাদ সংগ্রহ করা হলো। সর্বত্রই কঠোর ডিসিপ্লিন। নিজেদের ব্যাগ-জুতো-ফোন ফেরত নিয়ে এবার ভৈরোঁজীকে দর্শনের উদ্দেশ্যে দাঁড়ালাম রোপওয়ের দীর্ঘ লাইনে। অবশেষে ভৈরোঁজী দর্শন হলো। একই পথে ফিরে এলাম ভবনে। সেখানে বেশ খানিকক্ষণ বিশ্রামের পর ফেরার পালা। ফের সাত কিমি পদযাত্রা এবং একইভাবে অর্ধ্বকুয়ারী থেকে ঘোড়ায় চড়ে নীচে নেমে এলাম। পরচি কাউন্টারে পরচি জমা দিয়ে অটো করে হোটেলে ফিরতে রাত ১০টা। তাহির ভাই আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করে অপেক্ষা করছিলেন। গরম জলে স্নান সেরে খেয়েদেয়ে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, সত্যিই ঈশ্বরকে পেতে হলে অনেক শ্রম, নিষ্ঠা ও ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়।

ভবন। বৈষ্ণোদেবীর মন্দির
সব ক্লান্তি কাটিয়ে ফ্রেশ মুডে পরদিন সকাল ৯টা নাগাদ আমরা যাত্রা শুরু করলাম পহেলগাঁও-এর উদ্দেশে। কাটরা থেকে সামান্য কয়েক কিমি পাহাড়ি রাস্তায় যাওয়ার পর উঠে পড়লাম ৪৪নং জাতীয় সড়কে। প্রায় ৮০ কিমি অতিক্রম করার পর পৌঁছো্লাম চেনানী নাসিরি টানেলে, যার নতুন নাম শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী টানেল, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৯.২৮ কিমি। এই টানেল পাটনিটপ, কুদ এবং বাটোটে এলাকাকে সংযুক্ত করায় প্রায় ৪০ কিমি রাস্তা কমে গেছে। এরপর আমরা একে একে রামবান এলাকায় গড়ে ওঠা ক্যানোপি টানেল এবং অজস্র ছোটো বড়ো টানেল অতিক্রম করে পেলাম কাজীগুপ্ত এলাকায় নতুন বানিহাল টানেল যার দৈর্ঘ্য ৮.৪৫ কিমি। এই টানেল পার হতেই বাইরের আবহাওয়ার এক বিশেষ পরিবর্তন অনুভব করলাম যা মনটাকে খুশি খুশি করে তোলে। বেলা আড়াইটে নাগাদ পৌঁছলাম পহেলগাঁও। লীডার নদীর ধার দিয়ে চারদিকে সাদা বরফের পাহাড়ের মাঝ দিয়ে আসতে আসতে মনে হচ্ছিল ‘আহা কী দেখিলাম জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না’।
পহেলগাঁও পৌঁছে আমাদের নির্ধারিত হোটেল পহেলগাঁও প্রাইডে না ঢুকে ঘোড়া ঠিক করে বৈশরণ ভ্যালির উদ্দেশে রওনা দিলাম। আর পার্কিং-এ গাড়িতে আমাদের মালপত্র রইল তাহিরভাইয়ের জিম্মায়। ঘোড়ায় চড়ে প্রথম এক কিমি রাস্তা যাওয়ার পর শুরু হলো দুর্গম রাস্তা, ভয়ে বুক দুরদুর করতে করতে পৌঁছলাম বৈশরন ভ্যালিতে। যা মিনি সুইজারল্যান্ড বলে বিখ্যাত, এই পথে কয়েকটি ভিউপয়েন্ট পড়ে। ভ্যালিতে পৌঁছে প্রাণভরে নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করলাম। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর ফেরার পালা। কিন্তু সেই দুর্গম রাস্তায় ফিরবার কথা মনে পড়তেই সবার ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। সহিসরা বারবার সাহস যোগাতে থাকে, বলে যে ঘোড়া নিজেদের বাঁচার তাগিদে ঠিক পোঁছোবে, চিন্তার কিছু নেই। এর মধ্যে আবার শুরু হয়ে গেল ঠান্ডা কন্কনে বাতাস, আর তা সেই ভয়কে যেন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। যা হোক, ইষ্ট নাম জপতে জপতে একসময় নিরাপদে নীচে নেমে এলাম। পথে অনেককে ঘোড়া থেকে পড়ে যেতেও দেখলাম। নিশ্চয়ই ভয়ে আর নিজেদের সামলাতে পারেনি।
সেই বৈশরণ ব্যালি
তবে বৈশরণ ভ্যালির অবিস্মরণীয় সৌন্দর্যের কাছে এই ভয় তুচ্ছ। আমাদের কাশ্মীর থেকে ফিরে আসবার কয়েকদিন পরেই এই বৈশরণ ভ্যালিতে ঘটে যায় সেই রক্তাক্ত হত্যালীলা। এই সুন্দর উপত্যকায় মানুষ কী করে মানুষকে অবলীলায় হত্যা করতে পারে ভাবতেই পারি না! আমাদেরই মতো কিছু ছাপোষা নিরীহ মানুষ কষ্ট করে রোজগার করা টাকা খরচ করে গিয়েছিল সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে! কেন অকারণে প্রাণ দিতে হলো তাদের? উগ্রবাদ এত নির্মম হতে পারে? ভাবলেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে।
সন্ধে নামতেই বাড়তে থাকে ঠান্ডা। চা খেয়ে হোটেল থেকে বেরিয়েছিলাম সান্ধ্য ভ্রমণে এবং লাগোয়া রেস্তোরাঁতে রাতের খাবার সারতে। ঘরে যখন ফিরলাম তখন টেম্পারেচার তিন ডিগ্রি। বিছানায় দেখলাম পাতা রয়েছে হিটিং প্যাড, আর গায়ে দেওয়ার জন্য দুটো করে কম্বল।
পরদিন ভোর ছটা নাগাদ বিছানা ছেড়ে বাইরে এলাম। রাস্তার দোকানে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে যে নিসর্গ উপভোগ করলাম তা স্মৃতির মণিকোঠায় আমৃত্যু সঞ্চিত থাকবে। পাশেই লীডার নদীর কলকল আওয়াজ কানে ভেসে আসছিল। প্রাতরাশ সেরে রেডি হয়ে বেরোতে প্রায় দশটা বেজে গেল। আমরা লোকাল ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়ে একটা ক্যাব বুক করলাম সাইট সিয়িং এর জন্য। কারণ লোকাল সাইট সিয়িংএর জন্য বাইরের গাড়ির অনুমতি নেই। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে অতি মনোরম রাস্তা অতিক্রম করে প্রথমে পৌঁছে গেলাম আরু ভ্যালি। আরু ভ্যালিতে পৌঁছেই প্রথম অনুভব করলাম কাশ্মীরকে কেন ভূস্বর্গ বলা হয়।
লিডার নদীর ধারে
তারপর রাস্তার দুধারে প্রায় ১০ দিন আগেকার তুষারপাতে জমে থাকা বরফের স্তূপ দেখতে দেখতে পৌঁছো্লাম চন্দনওয়াড়ি বেস ক্যাম্প। এখান থেকেই প্রতিবছর জুলাই মাসে পবিত্র অমরনাথ যাত্রা শুরু হয়। চন্দনওয়াড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন ভালো করে দিতে বাধ্য। অমরনাথ যাত্রার রাস্তাটা দেখলাম পুরোপুরি বরফাবৃত্ত। স্থানীয়রা কয়েকজনকে দেখলাম স্লেজ গাড়িতে করে বরফের মধ্যে দিয়ে কিছুটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে পয়সার বিনিময়ে।
এরপর বহুচর্চিত বেতাব ভ্যালি। বেতাব সিনেমার শুটিং এখানে হওয়ার পর থেকে এই ভ্যালির নামকরণ বেতাব ভ্যালি। এই ভ্যালির প্রত্যেকটি কোণ খুবই ফোটোজনিক। এরপর পহেলগাও ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে ফিরে বিকেল চারটা নাগাদ তাহের ভাইয়ের গাড়িতে আমরা রওনা দিলাম শ্রীনগরের দিকে। পহেলগাঁও থেকে কিছুদূর আসার পর অবন্তিপোরা পেরেনোর আগে চোখে পড়ল রাস্তার দু’ধারে আপেল বাগান, প্রতিটি গাছে ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। একটি আপেল বাগানে আমরা দাঁড়ালাম, সেখানে কিছুক্ষণ ফটো সেশন-এর বিরতির সঙ্গে ফ্রেশ আপেল জুস পান করলাম। সাথে নিলাম খাঁটি জ্যাম, আচার ইত্যাদি। কিছুদূর যাবার পর পাম্পোর আসতে মনটা চা-এর জন্য আকুলি বিকুলি করাতে আবার জলপানের বিরতি, সেখানে ঝিলম নদীর অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে একটি রেস্তোরাঁয় চা-পান করলাম। শ্রীনগর ঢুকতে প্রায় রাত ৮টা বেজে গেল। আমরা পৌঁছোলাম আমাদের বহুদিনের পরিচিত ফ্যামিলি ফ্রেন্ড হুসেন চাচার বাড়িতে। গাড়ি গেটে দাঁড়াতেই বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা করে বাড়ি ভিতরে নিয়ে গেলেন এবং একটা প্রাইভেট রুম ছেড়ে দিয়ে বললেন, শ্রীনগরে যে-কদিন থাকব এটাই হবে আমাদের নিজস্ব আস্তানা।
পরদিন ঠিক সকাল ৯টা, তাহির ভাই এসে আমাদের নিয়ে বেরোলেন, প্রথম গন্তব্য শালিমার গার্ডেন, টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে অপূর্ব শোভা দেখতে দেখতে একজন গাইডের সাহায্য নিয়ে স্থানমাহাত্ম্য কিছুটা জেনে নেওয়া গেল। এরপর গেলাম নিশাত গার্ডেন, সেখানেও একদিকে পাহাড় আর একদিকে ডাল লেকের শোভা দেখতে দেখতে মনটা ভরে গেল। সেখানে আমার কন্যা কাশ্মীরী পোশাক পরে কিছু ছবিও তুলল। সেখান থেকে বেরিয়ে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য চশমসাহী গার্ডেন। এই গার্ডেন বিখ্যাত স্প্রিং ওয়াটারের জন্য। কথিত আছে এই জল পান করলে শরীর নীরোগ থাকে। এর অপরূপ শোভা এককথায় অবর্ণনীয়।
কাশ্মীরী পোশাকে কন্যা অদ্রিজা
এরপর আমাদের এদিনের শেষ দর্শনীয় স্থান ছিল এশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ গার্ডেন। গাড়ি থেকে নেমে প্রায় এক কিমি হেঁটে এই বাগানে ঢুকতে হয়। ঢোকার পরে এক স্বর্গীয় অনুভূতি হল। যেদিকে চোখ যায় নানা রঙের বাহার। এক এক সারিতে এক এক রঙের টিউলিপ, কোথাও আবার দুই রঙের মিশ্রণ। ঢুকে বুঝলাম একটা পুরো দিনও এখানকার জন্য যথেষ্ট নয়। এখানে চোখে পড়ল এক অভিনব পর্যটন কারবার। কয়েকটি উঠতি যুবক হাতে একটা করে আই ফোন, শ তিনেক টাকার বিনিময়ে আগ্রহীদের কয়েকটি ছবি তুলে নিয়ে নিমেষে তার সঙ্গে কোনো জনপ্রিয় গান জুড়ে দিয়ে মিনিট খানেকের রিল বানিয়ে দিচ্ছে। ডিজিটাল জমানায় এর চেয়ে অভিনব আর কী হতে পারে!
টিউলিপের বাগানে
ফেরার পথে ডাল লেকের সামনে এসে সামিয়ানা হোটেলে ঢুকেছিলাম কাশ্মীরী ওয়াজান-এর স্বাদ নেওয়ার জন্য। মূলত মাংস দিয়ে তৈরি রকমারি ডিশ, স্বাদের সঙ্গে মেলে নানান কাশ্মীরী মশলার খুশবু। এক চমৎকার অভিজ্ঞতা সন্দেহ নেই।
পরদিন আমাদের গন্তব্য শোনমার্গ, সঙ্গে থাজওয়াশ গ্লেসিয়ার। ঠিক সকাল ৮.৩০ মিনিটে যাত্রা শুরু করলাম, গগনজীর ও শোনমার্গ যুক্তধারা ৬.৫০ কিমি দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট Z-Morh টানেল অতিক্রম করে আমরা পৌঁছোলাম শোনমার্গ। এই রাস্তাটাই সোজা বালতাল, দ্রাস, কার্গিল অতিক্রম করে লেহ পর্যন্ত চলে গেছে। নেমে আমাদের চোখে পড়ল বরফশুভ্র মুকুটযুক্ত পাহাড় চূড়া। দেখে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। ঘোড়ার দরদাম করে তিনটি ঘোড়া নিয়ে যাত্রা শুরু হল থাজওয়াশ গ্লেসিয়ারের উদ্দেশে। তার আগে গামবুট ও হাঁটু পর্যন্ত জ্যাকেটে নিজেকে মুড়ে নিতে হয়। ঘোড়া বরফের ওপর দিয়ে চলতে শুরু করে। এখানে রাস্তা তুলনামূলক ভালো, যদিও পুরো পথটাই বরফে ঢাকা, মাঝে মাঝে কয়েকটি ভিউ পয়েন্ট পড়ে। এক জায়গায় কোনো এক অজ্ঞাত ছবির শুটিং চলতেও দেখি। এই করে প্রায় সাড়ে সাত কিমি পথ অতিক্রম করে আমরা পৌঁছোই গ্লেসিয়ারের চূড়ায়। ঘোড়া থেকে নেমে বরফের ওপর খানিক ঘোরাঘুরির মজা নেওয়া হল। কোথাও বরফ নরম থাকার কারণে পা ঢুকে যেতে থাকে আবার কোথাও পা পিছলাতে থাকে। বরফ নিয়ে মেয়ের সাথে ছোড়াছুঁড়ির খেলা হল। প্রায় ঘণ্টা দুই বাদে ঘোড়াওয়ালারা ফিরে যাওয়ার তাড়া দিতে থাকায় সাঙ্গ হল সেদিনের বরফ পর্ব। শ্রীনগর ফিরতে প্রায় রাত ৮টা বেজে গেল।

শোনমার্গ প্রবেশের টানেল
শোনমার্গ

বরফের রাজ্যে আমরা তিন
তারপরদিনের গন্তব্য ছিল গুলমার্গ। প্রায় সকাল ৮টায় বেরিয়ে পড়তে হল, কারণ গণ্ডোলা রাইড-এর জন্য খুব ভিড় হয়। পথে প্রাতরাশ সেরে মনোরম দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে গন্তব্যে পৌঁছতে প্রায় এগারোটা। একটা দোকান থেকে ভাড়ায় গামবুট ও জ্যাকেট সংগ্রহ করে প্রায় দেড় কিমি পায়ে হেঁটে পৌঁছলাম গণ্ডোলা রাইডের গেটে। পৌঁছে দেখি প্রায় কিলোমিটারখানেক দীর্ঘ লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে একসময় আমাদের নাম্বার এল। আধার কার্ড ও টিকিট দেখিয়ে প্রথম ফেজের কেবল কার-এ চড়ে বসলাম। বরফাবৃত মালভূমির ওপর দিয়ে কেবল কার চলতে শুরু করল। চারদিকের অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা পাহাড়ের ওপর দিকে উঠতে উঠতে মিনিট দশেক পর পৌঁছাই প্রথম ফেজের শিখরে। সেখানে নেমে চলে গেলাম দ্বিতীয় ফেজের টেবিল টপে। ফের প্রায় আট মিনিটের যাত্রা। কেবল স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে আশপাশ দেখে বুঝতে পারলাম প্রায় ৫-৬ ফুট বরফের ওপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সেই পুরু বরফের ওপরে চলাফেরা করতে আমাদের বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল, কোথাও পা ঢুকে যাচ্ছে তো কোথাও পা পিছলে যাচ্ছে। তবে পড়ে গিয়ে বরফের ওপর গড়াগড়ি খেতে ও বরফ নিয়ে খেলতে খেলতে নিজের বয়সটা কিছুক্ষণের জন্য অনেকটা কমে গেছিল। অনেকেই বরফের ওপর স্লেজিং করছিল, কেউ কেউ স্কি করছিল। বেলা চারটা নাগাদ মাইকে ঘোষণা হতে থাকে নীচে প্রথম ফেজে নামার জন্য। আমরা প্রথম ফেজে নেমে আসি। সেখানেও দেখি যারা উপরে যায়নি এখানেই স্লেজ চড়ছে, স্কি করছে। কেবল কারে ফেরার লাইনও সেই প্রায় কিলোমিটার খানেক লম্বা, পুরোটা নামতে নামতে সন্ধে সাতটা বাজল। জুতো-জ্যাকেট ফেরত দিয়ে গাড়িতে চেপে গন্ডোলা ও বরফের সুখানুভূতি নিয়ে শ্রীনগর ফিরে আসতে রাত নটা।

গুলমার্গ গন্ডোলার লাইন

গন্ডোলা সফর
আগের দিনের ক্লান্তি দূর করে আমাদের পরদিন বেরোতে একটু দেরি হল। সাড়ে দশটা নাগাদ রওনা দিয়ে প্রথম গন্তব্য গান্ডেরবাল এলাকায় ক্ষীরভবানী মন্দিরে। গেটে পরিচয়পত্র দেখিয়ে সমস্ত নথি লিপিবদ্ধ করে ভিতরে প্রবেশ। বেশ শান্ত স্নিগ্ধ মনোরম পরিবেশ। ট্রাস্টি বোর্ডের লোকজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এখানকার পৌরাণিক ইতিকথা। মা ভবানী রাবণের অত্যাচারে থাকতে না পেরে বজরংবলীর কমণ্ডুল করে শ্রীলঙ্কা থেকে এখানে এসেছিলেন। সেই থেকে তিনি এখানেই পূজিত হন। এবং তাঁকে ক্ষীর প্রসাদ দিয়ে পূজা করা হয় বলে তিনি ক্ষীরভবানী নামে পরিচিত। পূজার পর প্রত্যেককে স্টিলের বাটিতে পায়েস বা ক্ষীর দেওয়া হয়। তবে মন্দিরের বাইরে দাড়িওয়ালা মুসলিম ফুল-প্রসাদ বিক্রেতাকে “আইয়ে মাতাজীকে দর্শনকে লিয়ে ফুল ঔর প্রসাদ লেকে জাইয়ে” বলে হেঁকে পূজাসামগ্রী বিক্রি করতে দেখে কিন্তু বেশ লেগেছিল। এটাই তো আমার দেশ সনাতনী ভারত!
এরপর গেলাম আরেক পবিত্র তীর্থস্থান হজরতবাল মস্জিদ। এখানে হজরত মহম্মদের চুল সংরক্ষিত আছে। এরপর লালচক, সন্ধে অব্দি সেখানে ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া ও কেনাকাটি করার পর তাহির ভাই আমাদেরকে প্রথমে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন, বাড়ির সবার সাথে পরিচয় ও কাওয়া পানে আপ্যায়িত করলেন। তারপর গেলাম আব্দুল্লা চাচার বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। সব সেরে নিজেদের ডেরায় ফিরতে রাত প্রায় ১২টা।
কাশ্মীরী হালওয়া পরাঠা
কিন্তু কাশ্মীর মানেই চোখের সামনে সবার আগে যে ছবিটা ভেসে ওঠে তা হল ডাল লেকে হাউজবোট-শিকারা। পরদিন তাই আমাদের প্রথম গন্তব্য শিকারা। ৭নং জেটি থেকে দরদাম করে শিকারায় চেপে মেঘলা দিনের এক মনোরম পরিবেশে শুরু হয় আমাদের লেক বিহার। প্রায় দু ঘণ্টার এই শিকারা বিহারের মাঝে মীনাবাজারে নেমে জলের ওপর কয়েকটি দোকানে গেলাম। শিকারায় ভাসমান সব দোকান, কেউ চা নিয়ে আসছে, কেউ ফুল আনছে, তো আবার কেউ সবজি নিয়ে আসছে বিক্রির উদ্দেশ্যে যা বেশ অভিনব লাগল।

ডাল লেক শিকারা স্ট্যান্ড

ডাল লেকে হাউজ বোটের পসরা
এর মধ্যে ডাঙায় নেমে দ্বিপ্রাহরিক আহারের ব্রেক। ফের শিকারায় চেপে পৌঁছে গেলাম আমাদের নির্দিষ্ট হাউজবোটে। ব্যাগপত্র ঘরে রেখে সামনে বারান্দায় বসলাম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করবার জন্য, চোখে পড়ল দূরের পাহাড়ের মাথায় শঙ্করাচার্যের মন্দির। ডাল লেকের মনোরম ল্যান্ডস্কেপের মাঝে মাঝে শিকারা দোকানিদের আনাগোনা। সন্ধ্যার মুখে শুরু হল বৃষ্টি। চা পান সহযোগে দূরে আলোর রোশনাই দেখতে দেখতে যেন এক কল্পলোকে বিচরণ করছিলাম। রাত নটা নাগাদ হাউজবোটের বসার ঘরে নৈশভোজের ব্যবস্থা। রাত বাড়লে ঠান্ডা জোরালো হয়, ঘুম ঘুম পায়। এরপর নরম বিছানায় উষ্ণ কম্বলে জড়িয়ে সোজা ঘুমের দেশে।

আমাদের হাউজবোট
পরদিন সকাল সকাল উঠে ফের হাউসবোটের বারান্দায় বসে প্রকৃতির মনোরম দৃশ্যের মাঝে মাঝে নানারকম পাখির আনাগোনা, শিকারায় নানারকম পণ্যসামগ্রী/চা/ফুল/সবজি বিক্রয় বা ভ্রাম্যমান স্টুডিওর ফটোশেসন দেখতে দেখতে প্রাতঃরাশ-- সব মিলিয়ে সত্যিকারের এক রাজকীয় অবকাশ। বেলা এগারোটা নাগাদ চেক আউট, ডাল লেকের মায়া ত্যাগ করে আমরা এবার আহারবাল জলপ্রপাতের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম।
প্রায় ৭০ কিলোমিটার রাস্তায় প্রথমে পড়ে পাম্পোর, তারপর পুলওয়ামা, সোফিয়ান পার করে পৌঁছে গেলাম আহারবাল জলপ্রপাতের পার্কিং লটে। এরপর একটি সুন্দর পার্ক অতিক্রম করে প্রায় শ’খানেক সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছলাম জলপ্রপাতের খুব কাছে, সাবধানতার কারণে ফেন্সিং দিয়ে ঘেরা। জলপ্রপাতের তোড় এত বেশি যে আওয়াজে পাশের কারও সাথে জোরে কথা না বললে শোনা যাচ্ছে না। ফেরার পথে শুরু হল বৃষ্টি। প্রায় চারটে নাগাদ ফেরার রাস্তা ধরলাম। সন্ধের মুখে লালচকে ফিরে একটি পুরনো বাঙালি মিষ্টির দোকানে সামান্য জলযোগ সেরে ডেরায় ফিরে এলাম। এবারের মত আমাদের ভূস্বর্গে অধিষ্ঠান এখানেই সাঙ্গ হল।

আহারবাল জলপ্রপাত
পরদিন সবাইকে বিদায় জানিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম, জম্মু রেল স্টেশনে পৌঁছে গেলাম বিকেল তিনটে নাগাদ। এবার তাহিরভাইয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদের পালা। মন খারাপ দুই তরফেই। এই কটা দিন একসঙ্গে থাকায় এক অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়, কারণ মানুষগুলি বড় সহজ সরল ও অতিথিবৎসল, চট করে যে কাউকে আপন করে নিতে পারে।

হুসেন চাচার পরিবারের উষ্ণ আতিথেয়তা কোনোদিন ভুলবার নয়।

তাহের ভাইয়ের সঙ্গে বিদায়বেলায়
রাতের ন’টা পঁচিশের রাজধানী, পরদিন সকাল ছটায় নামিয়ে দিল নিউ দিল্লি স্টেশনে, সেখানে ঘন্টা কয়েকের জন্য এসি ওয়েটিং হলে আশ্রয় এবং তারপর মেট্রো রেল ধরে এয়ারপোর্ট।
বিকেলের কলকাতাগামী বিমানে যখন আকাশে উড়লাম, জানালা দিয়ে চোখে পড়ছিল দূরে নীল আকাশের সীমানায় অজানা বরফ শৃঙ্গের সারি। মনে হচ্ছিল ওখানেই কোথাও একটা ফেলে এসেছি তাহিরভাইদের। ওদের সদাহাস্যময় আপ্যায়ন-অভ্যর্থনার মধ্যে দিয়ে দশটা দিন যে কোথা দিয়ে পেরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। বড় তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরছিলাম আমরা, ফিরে গিয়ে সবাইকে বলব জম্মু-কাশ্মীর দেখার কাহিনি। আর সবশেষে একটা কথাই বলব, জীবনে অন্তত একটিবার হলেও কাটিয়ে আসা উচিত এই ভূস্বর্গের কোলে। মাটিতে সৃষ্ট এই স্বর্গ যে আমাদের একান্ত আপনার।