পশ্চিমঘাট পর্বতমালা প্রায় ষোলশ কিলোমিটার জুড়ে উত্তরের গুজরাত থেকে দক্ষিণে মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, কেরালা পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিমঘাটের বিভিন্ন অংশের স্থানীয় প্রাচীন নাম ভিন্ন ভিন্ন, তামিলনাড়ুতে যা নীলগিরি, কেরালায় সহ্য পর্বতম, আর মহারাষ্ট্রে নাম সহ্যাদ্রি। পৃথিবীর সেরা বায়োডাইভারসিটি হটস্পটের অন্যতম পশ্চিমঘাটের বন্যপ্রাণ নিয় বিশদ বিবরণের প্রয়োজন নেই। তবে কেরালার বন্যপ্রাণ বিশেষত পাখির সম্ভার নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, সহ্যাদ্রি নিয়ে ততটা চর্চা বা প্রচার নেই। পুনের আশপাশের জলে জঙ্গলে দেখা যাবে অসাধারণ কিছু পশুপাখি, ভারতের, এমনকি পৃথিবীর অন্য কোথাও যাদের দর্শন সুলভ নয়।
দলনেতা বিভাস দেবের আয়োজনে আমাদের ছয় জনের অরণ্যপ্রেমীর দল বেরিয়ে পড়লাম আগস্টের শেষ সপ্তাহে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মুম্বই পৌঁছে কারনালা বার্ড স্যাংচুয়ারি দিয়ে শুরু, আর শাশওয়ার্ড ভিগওয়ান পঞ্চগনি ঘুরে পুনায় শেষ। কলকাতা থেকে রাতের বিমানে মুম্বই পৌঁছলাম, ঠিক ভোর পাঁচটায় যাত্রা শুরু, বাইরে তখন ঘোর অন্ধকার আর হাল্কা বৃষ্টি। গন্তব্য দেড় ঘন্টা দূরের পানভেল। পানভেলে মুম্বই-এর সুউচ্চ ফ্ল্যাটবাড়ির সারির পর হঠাৎ দু দিকে দেখি অল্প উঁচু সবুজ পাহাড়ের পর পাহাড়, আর ঘন জঙ্গল। ড্রাইভার জানালেন এটিই কারনালা বার্ড স্যাংচুয়ারি। এই বিশাল এলাকায় কী ভাবে একটা মাত্র ছোট্ট পাখির খোঁজ পাব, ভেবে চিন্তায় পড়লাম। ওরিয়েন্টাল ডুয়ারফ কিংফিশার, যার চলতি নাম ওডিকেএফ, রঙ্গিন উজ্জ্বল এই মাছরাঙার একটা ভালো ছবির জন্য সারা পৃথিবীর পাখিপ্রেমিকরা এখানেই ছুটে আসেন। সারাদিনের ওডিকেএফ-এর ব্যাবস্থাপক মিস্টার দীপেন জি শা, তিনি গাইডসহ আরো তিন স্থানীয় সাহায্যকারী পাঠিয়েছেন।
ওরিয়েন্টাল ডুয়ারফ কিংফিশার
হাইওয়ে ছাড়িয়ে ডান দিকে গ্রামের রাস্তা ধরে কিছুক্ষণ এগোবার পর ঘন জঙ্গলে গাড়ি ঢুকল। আর রাস্তা নেই, এবার হাঁটা পথ। গাইড স্থানীয় মারাঠি যুবক, নাম মারুতি কাকতারি, পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। আধ ঘণ্টার পাহাড়ি পথে পার হলাম তিনটি ঝোরা, কাদাভরা ঘন ঘাসজঙ্গল। শেষে একটা ঝোরার ধারে পৌঁছে দেখি, আমাদের আগেই পাঁচ জনের একটি দল ট্রাইপডে লাগানো ক্যামেরায় চোখ রেখে বসে আছেন। আমরাও পাশাপাশি জায়গা নিলাম। সামনেই ছোট্ট পাহাড়ি নদী বা ঝোরা, তীব্র স্রোত, চারদিকে ঘন সবুজ জঙ্গল। যা বুঝলাম, জানলাম, নদীর ওপাড়ে ঝোপের আড়ালে মাটি পাথরের গর্তে বাসা বেঁধেছে পাখি দম্পতি, ভিতরে বাচ্চারা আছে, বাবা আর মা যে কোনো সময় খাবার মুখে নিয়ে উড়ে এসে বসবে, তখনই ছবি তুলতে হবে। আধ ঘণ্টা চুপচাপ কাটল, কারো দেখা নেই। মারুতি বলল, হতাশ হবার কিছু নেই, আসবে তো অবশ্যই। কথা সত্যি হল, হঠাৎই কোথা থেকে উড়ে এল হলুদ লাল গোলাপি বেগুনির তীব্র ঝলকানি, কোথায় যে ঢুকল আর বেরিয়ে গেল বুঝলাম না। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার, ছবি হল না। মারুতি আধা হিন্দি আধা মারাঠিতে আশ্বাস দিল, অনেক সময় আছে, ছবি হবেই। এরপর নিয়ম করে আসা শুরু হল, মোটামুটি কুড়ি পঁচিশ মিনিট অন্তর। মা এল অনেক বার, বাবা দু বার মাত্র, মুখে কখনও ফরেস্ট লিজার্ড, মারুতির কথায় জংলি ছিপকলি, কখনও ছোট্ট কাঁকড়া বা মাকড়সা। নামে মাছরাঙা, একবারও মাছ ধরতে দেখলাম না। মা পাখি আর বাবা পাখির মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল, খুব খুঁটিয়ে দেখে বুঝলাম পুরুষ পাখির রং বেশি উজ্জ্বল, মাথায় বেগুনি নীল রং বেশি, আকারে ছোট।
সকাল সাতটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত এখানেই কাটল, সবাই ছবি তুলে দিলখুশ। মারুতির সঙ্গীসাথীরা দু ঘন্টা অন্তর ফ্লাক্স খুলে গরম চা দিয়েছে, আর পেটভরা ব্রেক ফাস্ট। জানলাম জুলাই-এর দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত এদের দেখা পাওয়ার সুযোগ হয়, কারনালা আর রত্নগিরির তিন চারটি জায়গায়। প্রজননের জন্য বাসা বানায়, ছ-সাত দিন মেটিং-এর পর ডিম পাড়ে চার পাঁচটি, এগারো দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, কুড়ি দিন পর বাচ্চারা উড়তে শেখে, তার সাত দিনের মধ্যে মা বাবা বাচ্চাদের নিয়ে উড়ে চলে যায়। বছরের এই চল্লিশ দিন ছাড়া আর এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। পশ্চিমঘাটের গভীর অরণ্য ছাড়া এদের দেখা মেলে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটি জঙ্গলে।
সন্ধের মুখে পৌঁছলাম পুনে থেকে কুড়ি কিলোমিটার দুরে শাশওয়ার্ড, পরদিন সকাল থেকে শুরু হবে পাখির খোঁজ। সকাল সকাল ভিগওয়ান থেকে এসে পৌঁছেছে দুই গাড়ি, তার দুই যুবক চালকই গাইড, শংকর আর অবিনাশ। পাহাড়ের মাথায় আছে কানিকনাথ মন্দির, তার নীচের বিস্তীর্ণ ঘাসজমি পাখি দেখার আদর্শ জায়গা। গাইড বলল এই গ্রাসল্যান্ডে অন্তত কুড়ি প্রজাতির পাখি দেখা যাবে, কিন্তু আমাদের টার্গেট স্পিসিস হবে ব্রড টেইলড গ্রাসবার্ড, যেটি এখানে ছাড়া সারা ভারতে আর কোথাও দেখা যাবে না। উঁচু নীচু পাথুরে ঘাস জমিতে হাঁটা সহজ নয়, পড়ে গেলে ক্যামেরা সহ হাত-পা ভাঙ্গবে, আর ভয় লাগে জোঁক আর সাপকে। গাইডের অভয়বাণী, চলিয়ে চলিয়ে, কুছ নেহি হোগা। আধঘন্টা খোঁজার পর গ্রাস বার্ড-এর হদিস মিলল, কিন্তু একটা ছবির জন্য ছুটতে হল আরো আধ ঘণ্টা। খুঁজে পেলাম দুর্লভ সিরকির মালকোহা, ভালো ছবি হল না, বৃথা ছুটিয়ে বেড়ালো এই গাছ থেকে সেই গাছে। সকালের তিন ঘন্টার সংগ্রহ হল মালাবার, টাউনি আর বুশ, এই তিন রকমের লার্ক, হোয়াইট বেলিড মিনিভেট, স্ট্রায়োলেটেড বানটিং, অ্যাশি প্রিনিয়া, ইয়োলো আইড ব্যাবলার।
ব্রেকফাস্টে পাওভাজি আর চা খেয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হল। মন্দিরের উল্টো দিকে, পাহাড়ের নীচে কোয়েলের খোঁজ চলল। শঙ্কর বলেছিল, অল্প বৃষ্টির পর কোয়েল বাইরে বেরোয় রোদে গা শুকানোর জন্য। এক ঘন্টা ব্যর্থ অনুসন্ধানের পর বৃষ্টি নামল, থামার ঠিক দশ মিনিট বাদেই আবির্ভাব হল এক জোড়া জাঙ্গল বুশ কোয়েল। শঙ্করের তীক্ষ্ণ শ্রবণ শক্তি জানাল, উল্টো দিকে কিছুটা দূরে রেন কোয়েলের ডাক শোনা যাচ্ছে। সেখানে পৌঁছে একটু অপেক্ষার পরই ঝোপ থেকে বেরিয়ে পাথরের উপর গিয়ে বসল রেন কোয়েল। গলা উপরে তুলে ডাকতে লাগল। শঙ্কর বলল এটা মেটিং কল নয়, নিজস্ব সীমানা জানানোর কল। যে ছবির আশায় সবাই এখানে আসে, তেমনই এক ছবি পেয়ে সবার মন ভরে গেল।
বিকেলের লক্ষ্য ভারনাল হ্যাঙিং প্যারট, ভারতের একমাত্র প্যারট। প্রায় এক ঘন্টা চলার পর পৌঁছলাম সেলার ফার্ম, প্যারটের ঠিকানা। দেখি আরো অনেক পাখিপ্রেমী আলোকচিত্রীর ভিড়। প্যারট নেই, কিছু বায়া ওয়েভার, প্রিনিয়া ঘুরে বেড়িয়ে বাজরার দানা খাচ্ছে, এক ঝাঁক স্কেলি ব্রেস্টেড মুনিয়া আর রেড মুনিয়া সাঁ করে উড়ে এসে বসে ,আবার দ্রুত উড়ে যায়, ছবি তোলার সুযোগ দেয় না। ফার্মের মালিক বললেন, সকালে চার পাঁচটার একটা দল এসেছিল, বিকেলেও আসবে, একটু অপেক্ষা করুন। বেশি সময় লাগল না, এক জোড়া প্যারট এল, থাকল ঘন্টাখানেক, বাজরা খুটে খুটে খেল, ছবি হল মন্দ নয়। মাত্র মাসখানেকের জন্যই এখানে এরা আসে, তারপর কোথায় যে যায়, আর এ অঞ্চলের অসংখ্য বাজরা ক্ষেতে না নেমে এখানেই কেন আসে, এসব সত্যিই প্রকৃতির রহস্য।
ভারনাল হ্যাঙিং প্যারট
শাশওয়ার্ড থেকে ভিগওয়ান পৌঁছতে সন্ধে নামল, পরের তিন রাত থাকব অগ্নিপঙখ হোমস্টে-র আতিথেয়তায়। মালিক সন্দীপ নাগারে, ভিগওয়ানের বিখ্যাত গাইড, তিন দিন আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। রাতে খাবার টেবিলে সন্দীপ ভাইয়ের পরিকল্পনা ও নির্দেশ শুনলাম। যে সব পশুপাখির দর্শন আমাদের লক্ষ্য, তারা কেউই একজায়গায় থাকে না, খুঁজতে হবে ভিন্ন ভিন্ন এলাকায়, এখান থেকে যার দূরত্ব কোনোটার কুড়ি কিলোমিটার আবার কোনোটার একশো কিলোমিটার। তাই যাত্রা শুরু করতে হবে প্রতিদিন ঠিক ভোর পাঁচটায়, বা আরো আগে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহে এখানে সূর্যের আলো ফোটে সকাল ছটায়। তার আগেই চলে এলাম কড়নওয়াড়ি ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির গেটে। প্রথম দিন সকালের টার্গেট ইন্ডিয়ান উলফ আর ইন্ডিয়ান স্ট্রাইপড হায়েনা, সঙ্গে ইন্ডিয়ান ফক্স। বিশাল এলাকা, পাহাড়ের পর পাহাড়, মাঝের বিস্তীর্ণ উপত্যকা সবুজ ঘাস আর বুনো ফুলে ঢাকা, মাঝে ছোট ছোট জলাশয়, সেখানে চরে বেড়ায় ইন্ডিয়ান স্পট বিল ডাক, কটন পিগমি গুজ। ইন্ডিয়ান গেজেল বা চিংকারা চার পাঁচটার দলে ঘুরে ঘাস খেতে ব্যস্ত। সকালের নরম আলোয় অসাধারণ সুন্দর সে দৃশ্য অপার্থিব মনে হয়। সন্দীপের নির্দেশ, এসবের পিছনে অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না, চড়া রোদ উঠলে নেকড়ে বা হায়না কেউই দেখা দেবে না। বলতে বলতে একটা বড় সাইজের বুনো খরগোশ লাফিয়ে রাস্তা পার হল, যার ছবি তোলা অসম্ভব। সন্দীপের দৃষ্টি শক্তি মারাত্মক, বলল পাহাড়ের ওই ঢালে একটা ফক্স বসে আছে, গাড়ি ছুটল দ্রুত। আমাদের দেখে খ্যাকশেয়ালও ছুট লাগাল, পেছন পেছন ছুটে আলোর বিপরীতে ছবি ভালো হল না।
বন দফতরের গাইড সকালেই আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার দাম আছে বুঝলাম, যখন সন্দীপ তাঁর কথায় পাহাড়ের উল্টো দিকে গাড়ি ছোটালেন। পাঁচ মিনিট পরেই বললেন, ও দেখিয়ে, ব্যায়ঠা হ্যায় ইন্ডিয়ান উলফ, মেল ফিমেল, ও পেড় কা নীচে, পানিকে পাশ। দূর থেকে বুঝলাম সত্যিই দুটো নেকড়ে বসে, গাড়ি ছুটল দ্রুত ভালো ছবির জন্য। নেকড়েরাও ছুট লাগাল। আমরা গাড়ি নিয়ে চললাম কখনও পিছনে, কখনও পাশাপাশি। মিনিট দশেক এরকম দৌড় দৌড় খেলার পর, নেকড়েরা যখন উঁচু টিলার মাথায় উঠে গেল, তখন আমরা রণে ভঙ্গ দিলাম, ততক্ষনে ছবি হল মন্দ নয়। চড়া রোদ উঠেছে, আর হায়েনার খোঁজ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ইন্ডিয়ান উলফ
তখন সকাল দশটা বাজে, স্যাংচুয়ারির সরকারী নিয়মমত সময় শেষ। সন্দীপ বললেন, এখন বাইরে বেরিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা পাহাড়তলির জমিতে খোঁজ করব দুটো ফ্র্যাঙ্কোলিন আর দুরকম কোয়েল। আকাশ মাঝে মাঝেই মেঘে ডাকছে, সঙ্গে হাল্কা বৃষ্টি। এদের জন্য আদর্শ আবহাওয়া। একটা উঁচু টিলার ঢাল বেয়ে কসরত করে গাড়ি উপরে উঠল। সহজেই পেলাম গ্রে ফ্র্যাঙ্কোলিন। পেন্টেড ফ্র্যাঙ্কোলিনের জন্য অবশ্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। অল্প বৃষ্টির পর ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পাথরের উপর উঠে গলা তুলে ডাক ছাড়ল। সন্দীপ বললেন, জেম অফ ভিগওয়ান, আপনারা দারুণ ছবি পেলেন। রক বুশ কোয়েল আর বারেড বাটন কোয়েলের ভাল ছবি হল বিকেল বেলা। সহজেই দেখা মেলে চেষ্টনাট বেলিড স্যান্ড গ্রাউজ, কিন্তু পেন্টেড স্যান্ড গ্রাউজ-এর জন্য অপেক্ষা করতে হল, খুঁজতে হল এক ঘন্টা ধরে।
গ্রে ফ্র্যাঙ্কোলিন
চেষ্টনাট বেলিড স্যান্ড গ্রাউজ
পেন্টেড স্যান্ড গ্রাউজ
পরের দিন আরো আগে ঘুম থেকে উঠলাম, সূর্য ওঠার আগেই পৌঁছতে হবে হায়েনার জায়গায়। সন্দীপ আগের দিনই বলেছিলেন, এদিন শুধুমাত্র হায়েনার জন্য যেতে হবে চল্লিশ কিলোমিটার দূরের শিরসুফল ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি। গেট পেরিয়ে যখন ভিতরে ঢুকলাম তখনও আলো ফোটেনি, গাইড গাড়িতে উঠে ইশারা করলেন, যে দিকে যেতে হবে। দশ মিনিট পরে খোঁজ পাওয়া গেল, হায়েনা বসে ছিল ঝোপের আড়ালে অনেকটা দূরে, আধো অন্ধকারে ছবি হচ্ছিল না। কাছাকাছি যেতেই ঝোপ থেকে বেরিয়ে হায়েনা দৌড় দিল, পিছন পিছন আমরাও। জঙ্গল পেরিয়ে ঘাসের মাঠ, মাঠ পেরিয়ে ছোট পাহাড় টিলা, টিলা পেরিয়ে আবার মাঠ জঙ্গল। এভাবেই চলল মিনিট কুড়ির প্রাণান্তকর ছুট, চড়াই উতরাই সমতলে। ছবি তোলা যাচ্ছে না, চিন্তায় পড়লাম। একটা টিলার এক ঢালে ঝোপের ভিতরে হায়েনা গিয়ে যে ঢুকল আর বের হল না। গাইড বললেন, ও নিশ্চয়ই বেরোবে আর সন্দীপ অভয় দিলেন ছবি অবশ্যই হবে, আমাদের ভালো পজিশন নিতে হবে।
আমরা ঠিক উল্টো দিকের বড় টিলার মাথার উপরে উঠে চুপচাপ গাড়ির ভিতরে বসে রইলাম। কখনও মেঘ জমে হাল্কা বৃষ্টি, কখনও অল্প রোদ। সহ্যাদ্রির এই অংশের সৌন্দর্য অসাধারণ, এই টিলার উপর দাড়িয়ে বাঁ দিকের মেঘে ঘেরা অনুচ্চ সবুজ পাহাড় যদি মনে করায় স্কটিশ হাল্যান্ড, উল্টো দিকের আকাশিয়া গাছের টিলা ঘাস জমির বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে আফ্রিকান সাভানা বলে ভুল হয়। মিনিট কুড়ি অপেক্ষার পর হায়েনাটা সত্যিই বের হল। যে দিকে ছুটল আমরা গাড়ির গতি বাড়িয়ে সামনের দিকে পৌঁছে মুখোমুখি ছবি পেলাম ইন্ডিয়ান স্ট্রাইপড হায়েনা-র।
ইন্ডিয়ান স্ট্রাইপড হায়েনা
পরদিন বিকেলের লক্ষ্য ইন্ডিয়ান ঈগল আউল আর মটলড উড আউল। তার জন্য যেতে হবেই ভিগওয়ান শহর ছাড়িয়ে পঁচিশ কিলোমিটার দূরে বারামত-র দিকে। ভারতের মাত্র যে কটা জায়গাতে ইন্ডিয়ান ঈগল আউল মেলে, এটি তার একটি। সন্দীপ বললেন, খুব সকালে এদের পাথরের উপর পাওয়া যায়, যেখানে বড় ইঁদুর খরগোশ ধরে খায়, কিন্তু বেলা বাড়লে বড় গাছের ডালে লুকিয়ে থাকে, খোঁজা সহজ নয়। পাক্কা এক ঘন্টা লাগল খুঁজতে, ছবির সুযোগ দিল। আর মটলড উড আউল-এর খোঁজ পেলাম একটু দূরের জঙ্গলে, ভালো ছবির জন্য গাড়ি থেকে নামতেই উড়ে পালালো, পিছন পিছন আমরাও দৌড় দিলাম জঙ্গলের মাঝে। গাছপাতার মাঝে একটা মুখ লুকানো ছবির হল।
ইন্ডিয়ান ঈগল আউল
মটলড উড আউল
ভাগ্য প্রসন্ন ছিল, পথের ধারে পেয়ে গেলাম ব্লু ফেসড মালকোহা। ফেরার সময় সন্দীপ বললেন, আজ রাতে ডিনারের পর নাইটজার সাফারি হবে, তবে এই দিনের আলোতেই আপনাদের নাইটজার দেখাব। তাঁর দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞ চোখ ঠিক খুঁজে বার করল ইন্ডিয়ান নাইটজার আর একটু পরেই সাভানা নাইটজার। রাতের সাফারিতে পেলাম জাঙ্গল ক্যাট আর ক্যামিলিয়ন।
আমরা যেখানে আছি, সেই অগ্নিপঙ্খ হোম স্টে-র অবস্থান ভিগওয়ান শহর থেকে দশ কিলোমিটার দুরে কুম্ভরগাঁও, ভীমা নদীর তীরে। শীতে এটাই হয়ে ওঠে অসংখ্য ফ্লেমিঙ্গো আর পেলিক্যানের আস্তানা। এখনও বোট চেপে খুঁজলে কিছু রেসিডেন্ট পাখির দেখা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এই সফরে সে সময় নেই। পরের দিন ভোর চারটায় উঠতে হল, একশো কিলোমিটার পথে পাড়ি দেব পঞ্চগনির কাছে কোয়না ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি, এখন শুধুমাত্র ওখানেই দেখা যাবে পেন্টেড বুশ কোয়েল। হাল্কা বৃষ্টি আছে, মেঘ কুয়াশা আছে, কোয়েলের জন্য আদর্শ আবহাওয়া। খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেলাম কাস পঠার, মহারাষ্ট্রের ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারস, অনেকটা উঁচুতে। আবার নীচে নামলাম, খোঁজ আর খোঁজ। পাক্কা পাঁচ ঘণ্টা পর ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হলেন। ফুলের বনে আরাধ্য পেন্টেড বুশ কোয়েল-এর দুই ঠোঁট খুলে গলা ছেড়ে ডাক শুনলাম, দেখলাম, ছবি হল মনের মত।
পেন্টেড বুশ কোয়েল