Jajahatu

ঊইকেন্ডে বনপাহাড়ির দেশ জাজাহাতু

শুভজিৎ তোকদার

পুরুলিয়া পর্যটন বললেই প্রথমে যেটা মনে আসে অযোধ্যা হিলটপ আর অন্যদিকে গড়পঞ্চকোট, জয়চন্ডী পাহাড়। সে তুলনায় পুরুলিয়ার ঝালদা অনেকটাই সুয়োরানীর মতো।প্রকৃতপক্ষে পুরুলিয়ার পর্যটনকে তিনটে ভাগে ভাগ করা যায়।

১) রঘুনাথপুর সার্কিট - পাঞ্চেত, বড়ন্তি, গড়পঞ্চকোট, জয়চন্ডী পাহাড়

২) বাঘমুন্ডি সার্কিট - অযোধ্যা হিলটপ সার্কিট

৩) ঝালদা সার্কিট - বেগুনকোদর, মুরুগমা ড্যাম ইত্যাদি নিয়ে।

বনপাহাড়ির দেশ জাজাহাতু এই ঝালদা অঞ্চলেই বাংলা-ঝাড়খন্ড সীমান্তে অবস্থিত। ঝাড়খণ্ডের মুড়ি থেকে ২৫ কিমি দূরে, বাংলার ঝালদা শহর থেকে ১৪ কিমি দূরে পুরুলিয়া পর্যটনের নতুন দিগন্ত জাজাহাতু। জাজাহাতু মানে তেঁতুলের দেশ। জাজা মানে তেঁতুল। আর হাতু মানে বসতি। তাই এককালে প্রচুর তেঁতুল গাছ থাকায় এই গ্রামের নাম জাজাহাতু। গোটা পাঁচেক ড্যাম, পাহাড়, নদী নিয়ে জাজাহাতু আপনাকে স্বাগত জানাবে। বসন্তের উপরি পাওনা পলাশের আগুন তো আছেই। আর থাকার জন্য সুইস টেন্ট, বাড়ি নিয়ে আছে বনপাহাড়ি ইকো হোমস্টে।

একাকী ঝটিকা অভিযানে

পায়ের তলায় সর্ষে। তাই বেশিদিন ঘরে থাকতে ভালো লাগে না। জানুয়ারির শেষেই কপিলাস সাতকোশিয়া থেকে ফিরেই মনটা আনচান করছিল, সরস্বতী পুজো মিটতেই খোঁজ লাগালাম কোথায় যাওয়া যায়। মনে এলো জাজাহাতুর নাম। পুরুলিয়ার ঝালদা ব্লকে একদমই অজানা অচেনা জায়গা। গোটা পাঁচেক ড্যাম আর বনপাহাড়ি ইকো হোম স্টে-তে সুইস টেন্ট নিয়ে পুরুলিয়ার পর্যটনের নতুন দিগন্ত জাজাহাতু। জাজাহাতু যাওয়া মনস্থির করে নিকট কয়েকজন ভ্রমণবন্ধুকে জানালাম, কিন্তু বিভিন্ন কারনে কাউকে পাওয়া গেল না। কিন্তু তাতে না দমে ঠিক করলাম এইবার একাকী ভ্রমণে বেরোবো। সোলো ট্রাভেলারের অভিজ্ঞতা অর্জনের সময় এসে গেছে।

ফেসবুকে বনপাহাড়ি ইকো হোম স্টে পেজ থেকে প্রথমেই হোম স্টে কর্ণধার দীপঙ্করবাবুকে ফোন করলাম। সবকিছু ঠিক করে টাকাও পাঠিয়ে দিলাম। এদিকে এতো কম সময়ে ট্রেনের টিকিটও নেই। হাওড়া রাঁচি এক্সপ্রেসে মুড়ি স্টেশনে নেমে ঝালদা হয়ে যেতে হয় জাজাহাতু। ট্রেনের কনফার্ম টিকিটও নেই। কিন্তু জেদ চেপে গেছে যাবোই। তৎকালে ভরসা করে স্থানীয় এজেন্ট থেকে তৎকালে টিকিট কেটে ফেললাম। দীপঙ্কর বাবু, বনপাহাড়ির ম্যানেজার বিমলবাবুর ফোন নাম্বার দিয়ে দিয়েছিলেন। ঘোরার জন্য গাড়ির খোঁজও দিয়েছিলেন। কিন্তু সোলো ট্রাভেলারের জন্য গাড়ি ভাড়া বড্ড বেশি মনে হলো। বিমলের সাথে ফোনে আলোচনায় মুস্কিল আসান হয়ে গেল। আমি একাকী পর্যটক শুনে বিমলই অফার করল বাইকে ঘোরাবে আমাকে এবং ভাড়াও খুবই নামমাত্র। আকাশে চাঁদ পাওয়ার মতো। লুফে নিলাম সেই প্রস্তাব। বিমল সাথে এও পরামর্শ দিল মুড়ি থেকে ঝালদা চলে আসতে। যাইহোক, সবকিছু ফাইনাল করে রবিবার রাতে হাওড়া থেকে ক্রিয়াযোগ এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম।

পরদিন ভোরবেলা চারটের সময় মুড়ি স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। ২৫ কিমি রাস্তা মুড়ি থেকে জাজাহাতু। ভোরবেলায় স্বাভাবিকভাবেই অটোওয়ালা অনেক টাকা ভাড়া চায়। সামনের চায়ের দোকানি পরামর্শ দেয় ঝালদা যাওয়ার ট্রেন আধঘন্টা পরই। বোকারো আসানসোল মেমু। দশ টাকা টিকিটেই কুড়ি মিনিটে আমাকে মুড়ি থেকে ঝালদা পৌঁছে দেয়। এরপর ঝালদায় এক টোটো রিজার্ভ করে ১৪ কিমি রাস্তা ২০০টাকা ভাড়ায় পৌঁছে দেয়। একদমই নামমাত্র ভাড়া। মোটামুটি ভোরবেলা সকাল ছয়টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম জাজাহাতু বনপাহাড়ি ইকো হোম স্টে। একদিকে সূর্য উঠছে, মোরগ ডাকছে, আর আমিও পৌঁছে গেলাম বনপাহাড়ির দেশে। হোমস্টের দুই স্টাফ রাহুল এবং রতন গেট খুলে আমাকে নির্দিষ্ট সুইস টেন্ট দিয়ে দিল। প্রথম দর্শনেই এতো ভালো লেগে গেলো যে, ঘুম চোখেই ছবি এবং ভিডিও তুলতে শুরু করে দিলাম। তারপর টেন্টে ঢুকে একটু ঘুমের দেশের চলে গেলাম। সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুম দিয়ে উঠে স্নান ইত্যাদি সেরে ফের ফটোসেশন শুরু হলো। ওদিকে রাহুল আর রতন ব্রেকফাস্ট রেডি করে ফেলেছে। লুচি, তরকারি, ডিমসেদ্ধ, মিষ্টি, কলা। দারুন খাওয়া। ব্রেকফাস্ট শেষ করতে করতে বিমল চলে এল। বিমলই বললো আজ বাইকে সারাদিন রাহুল আর রতন আমাকে ঘুরিয়ে দেখাবে। প্রথম হাফে রাহুল, লাঞ্চের পর রতন।

রাহুলের সাথে প্রথমেই গেলাম ১২ কিমি দূরে রূপাই নদীর বাঁধ প্রকল্প কুঁকি ড্যামে। বালিহাঁসের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুবই সুন্দর কুঁকি ড্যাম। আধঘন্টা সেখানেই কাটিয়ে এরপর চলে এলাম জাজাহাতু বনপাহাড়ির কাছে ল্যাকরাকুদি ড্যামে। বর্ষায় জল থাকলেও শীতকালে বিশেষ জল থাকেনা। স্থানীয় ভাষায় ল্যাকরা মানে শেয়াল আর কুদি মানে পুঁতে ফেলা। এককালে এখানে নাকি শেয়াল পুঁতে ফেলা হতো বলে এমন নামকরণ। জারিয়া, সিন্দ্রিয়া, কীর্তনিয়া এই তিন পাহাড়ের ঢালেই জাজাহাতু থেকে পায়ে হেঁটে ল্যাকরাকুদি ড্যাম যাওয়া যায়। সবকিছু রাহুল আর রতনইবলে দিচ্ছিলো।

এরপর রাহুল নিয়ে গেলো পাদরী ড্যাম। চেমটাবুরু পাহাড়ের একদিকে খয়রাবেড়া ড্যাম জানি, কিন্তু পাহাড়ের অন্যধারে এই পাদরী ড্যাম। ড্যামে কী সুন্দর চেমটাবুরুর ছায়া পড়ে। পাদরী ড্যামের রাস্তা ধরেই জেলেংসিরিং হয়ে জাজাহাতু থেকে পৌঁছে যাওয়া যায় অযোধ্যা হিলটপ। পাদরী ড্যাম যাওয়ার পথেই পড়ে রূপাই নদী। যে রূপাই নদীর জল ধরে তৈরি হয়েছে কুঁকি ড্যাম।

পাদরী ড্যাম দেখে লাঞ্চের আগে শেষ গন্তব্য লায়েক বাঁধ। এটাও পায়ে হেঁটে বনপাহাড়ি থেকে দেখা যায়। এটি একটি কৃত্রিম বাঁধ। লায়েক বাঁধের সবচেয়ে বড় ইউএসপি হলো একসাথে গজাবুরু এবং চেমটাবুরু - পুরুলিয়ার দুই সর্বোচ্চ পাহাড়কে এক ফ্রেমে বন্দী করা যায়। এছাড়া লায়েক বাঁধ থেকে অপরূপ সূর্যাস্ত দেখা যায়।

বেলা দেড়টা বেজে গেছে। ক্ষিদে পেয়ে গেছে। রাহুলের বাইক ফিরিয়ে নিয়ে এলো বনপাহাড়িতে। দুপুরের খাওয়া ঘি, ভাত, আলুভাজা, বেগুনভাজা, একটা তরকারি, দুপিস রুইমাছের ঝোল, চাটনি, পাঁপড়। খাওয়া সেরে আধঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে আড়াইটা নাগাদ এইবার রতনের সাথে বের হলাম নরোহারা ড্যাম এবং মুরুগুমা ড্যাম দেখার জন্য।

রতন প্রথমেই নিয়ে গেলো নরোহারা ড্যামে। ঝালদা পেরিয়ে অনেকটা দূরেই ড্যামটা। খুবই সুন্দর। সূর্যাস্ত এখানেও খুব সুন্দর দেখা যায়। কিন্তু সূর্যাস্তের সময় তখন নয় বলে নরোহারা ড্যাম দেখে আমরা ঝালদা বেগুনকোদর হয়ে পৌঁছে গেলাম মুরুগুমা ড্যামে। রাস্তায় ঝালদায় একটা পলাশ গাছে ফেব্রুয়ারি মাসেই হঠাৎ পলাশফুল পেয়ে গেলাম। মুরুগুমা এর আগে বার তিনেক এসেছি। এইবার বাড়তি পাওনা মুরুগুমা ড্যামের বুকে সূর্যাস্ত দেখা। তবে রতন বলেছিল লায়েক বাঁধে সূর্যাস্ত দেখাবে। সেই মতো আমরা মুরুগুমা ড্যাম ঘুরে ফেরার রাস্তা ধরছি তখনই ধরা পড়ল বাইকের টায়ার পাংচার হয়েছে। অগত্যা আমাকে মুরুগুমা ড্যামেই সূর্যাস্ত উপভোগ করতে বলে রতন বাইক নিয়ে কাছাকাছি দোকানে চলে গেল। আমি মুরুগ্গুমা ড্যামে এক সুন্দর সূর্যাস্তের সাক্ষী থাকলাম। মনের খুশিতে ক্যামেরাবন্দী করলাম সেইসব ছবি। সন্ধ্যার মুখে রতনও বাইক সারিয়ে  ফিরে এলো। আমাকে নিয়ে এইবার বনপাহাড়ি ফেরার পালা। রাস্তায় আবার উটকো বিপদ - ঝালদায় রাস্তায় বাইক চেকিং করছে পুলিশ। হেলমেট নেই সাথে। রতন পরামর্শ দিল, আপনি হেঁটে পেরিয়ে যান, আমি বাইক নিয়ে ঘুরপথে আসছি। প্রথমে চাকা লিক, তারপর হেলমেট না থাকায় অনেকটা সময় নষ্ট হলো।এদিকে ফিরতে হবে রাতের ট্রেন ধরে। বিমলকে ফোন লাগালাম। আমার বলার আগেই টোটো বিমল ঠিক করে রেখেছে। বনপাহাড়ি থেকে ঝালদা স্টেশনে রাতে নটার সময় পৌঁছে দেবে, ৩০০ টাকা নেবে। আর চিন্তা নেই। সন্ধ্যা সাতটায় ফিরে এলাম বনপাহাড়িতে। ফিরতেই রাহুল বেগুনি খাওয়াল গরম গরম। এইবার গুছানোর পালা, ফেরার পালা। রাতে আটটায় আর্লি ডিনার (ভাত, ডাল, আলুভাজা, চিকেন) সেরে বিমল, রাহুল, রতনকে বিশেষ ধন্যবাদ ও বিদায় জানিয়ে টোটোয় ঝালদা স্টেশন চলে এলাম। সেখান থেকে রাত দশটায় সেই ফিরতি আসানসোল বোকারো মেমু ধরে মুড়ি স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। রাত সাড়ে এগারোটায় রাঁচি হাওড়া ক্রিয়াযোগ এক্সপ্রেসে উঠে পরদিন সকালে পৌঁছে গেলাম প্রতিদিনের রুটিন জীবনে। স্মৃতিতে থেকে গেল অজানা পুরুলিয়ার বনপাহাড়ির দেশ জাজাহাতু।

গাড়ি নিয়ে গেলে বর্ধমান-দুর্গাপুর-আসানসোল-রঘুনাথপুর হয়ে কোটশিলা-ঝালদা,তারপর ইচাগ মোড়। সেখান থেকে ৭ কিমি দূরে জাজাহাতু। কলকাতা থেকে বাই রোড জাজাহাতু প্রায় ৩৮০ কিমি।সুইস টেন্ট আর দুটো রুম নিয়ে গড়ে উঠেছে বনপাহাড়ি ইকো হোমস্টে। এক একটা সুইস টেন্টে চারজনের থাকার ব্যবস্থা। আর রুমে তিনজন করে। মোট আঠারো জন পর্যটক একসাথে থাকতে পারবেন। বাথরুম ওয়েস্টার্ন, খাওয়াদাওয়ার চারবেলা এলাহি ব্যবস্থা এবং অতিথিপরায়নতা মুগ্ধ করার মতো। হোমস্টে মালিক দীপঙ্কর মজুমদার -৯৩৩১৮৪৫২২০/৯৯০৩৪০০৭১৪

সাম্প্রতিক সংযোজিত প্রতিবেদন

দ্রষ্টব্যঃ এই ওয়েব ম্যাগাজিনে কিছু ছবি ইন্টারনেট থেকে ব্যবহৃত হতে পারে। তাদের দিকে আমাদের আত্মিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই ম্যাগাজিনে তথ্য এবং মন্তব্যসমূহ লেখক/লেখিকাদের দ্বারা প্রদান করা হয়েছে, প্রকাশক/সম্পাদক কোনো বার্তা, মন্তব্য, ভুল অথবা বিষয় অসম্পূর্ণতা সম্পর্কে কোনও দায়বদ্ধতা গ্রহণ করেন না।
কপিরাইট © ২০২৬.
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত: রংরুট.অনলাইন
ডিজাইন ও ডেভেলপ করেছে: উইকিইন্ড
রক্ষণাবেক্ষণ: টিম রংরুট